ই-কমার্স সম্পর্কে আমাদের ভুল ধারণা

ই -কমার্স একটি প্রযুক্তি ও জ্ঞান ভিত্তিক বিজনেস। এই বিজনেস টি করতে হলে এর সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হয়। বর্তমানে তথ্য প্রবাহের অবাধ গতির কারণে ই-কমার্স সম্পর্কে চাইলে অনেক কিছু জানা যায়। যাদের জানার আগ্রহ আছে তারা অনেকে অনেক কিছু জানতেও পারছে। আবার একই কারণে অনেক ভুল বার্তাও প্রচারিত হয়ে মাঝে মধ্যে। সেসব বার্তাগুলো জনসাধারণ বা অনেকের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সেসব কিছু ভুল ধারণা নিয়ে আমার আজকের লেখা।

🔹 ভুল ধারণা- ১: ই-কমার্স কোনো রকম পুঁজি ছাড়াই করা যায়।

ইতোমধ্যে এ ধরনের একটি ধারণা রয়েছে আমাদের অনেকের মধ্যেই। তবে ধারণাটা মোটেও সঠিক নয়। আপনার একটি ই-কমার্স পরিচালনা করার জন্য অন্য যেকোনো ব্যবসার মতোই কিছু রিসোর্স প্রয়োজন হয়। একটি ফিজিক্যাল শপ ছাড়াই ভার্চুয়াল শপ দিয়ে ব্যবসা করা যায় এর মানে এই নয় যে, এটা পুঁজিবিহীন বিজনেস। মোট কথা হলো ই-কমার্সের জন্য আপনার ফেসবুক পেজ, ডোমেইন হোস্টিং, ওয়েবসাইট, পন্য বা পন্যের ছবি, ডেলিভারী এজেন্ট, কাস্টমার কেয়ার এজেন্ট, প্রোডাক্ট আপলোড, প্যাকিং, পরিবহন সবকিছুরই প্রয়োজন হয়। এগেুলো প্রতিটি রিসোর্স অর্থের বিনিময়ে সংযোগ নিতে হয়। আবার তার বিনিময়ে ক্রেতার কাছ থেকে লাভও করা যায়। এসব রিসোর্স যদি আপনি বিনে পয়সায় পান তাহলে তো যে কোনো ব্যবসায় পুঁজি ছাড়া করা যায়। এবার তাহলে আপনি-ই চিন্তা করুন, আপনার ই-কমার্স বিজনেস এর জন্য পুঁজি লাগবে, কি লাগবে না।

🔹 ভুল ধারণা- ২: ঘরে বসে ই-কমার্স করা যায়।

ভাইরে সব ব্যবসাই তো ঘরে বসে করতে হয়, রাস্তার পাশে হকারী ছাড়া। আর যদি বলি দোকান বা অফিস সেগুলোওতো ঘর। আপনি যদি বলতে চান বাসায় বসে ই-কমার্স করা যায়। তাহলে আমি বলব ই-কমার্সের একটা অংশ মাত্র ঘরে বসে করা যায়, পুরো টা নয়। হয়তো আপনার সাইটে বা পেজ এ পন্যের ছবি আপলোড, ফোনে কথা বলা এগুলো ঘরে বসে করা যেতে পারে কিন্তু আপনাকে আপনার পন্য কাস্টমারের বাসায় পৌঁছে দিতে হলে কিভাবে ঘরে বসে করবেন? আপনি নিজে যান কাউকে পাঠান বা কোনো কুরিয়ার এজেন্ট নেন আপনারতো কাস্টমারের বাড়ি পর্যন্ত যেতে হবে। তারপর রয়েছে পন্য সংগ্রহ বা পন্য ক্রয় করা। সবপন্য নিশ্চই আপনি ঘরে বসে বানাবেন না আর বানালেও আপনাকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হবে। তার পরবর্তী পর্যায় আপনার সাথে যদি আর কোনো টীম মেম্বার লাগে তাহলে তাকে দিয়া ঘরে বসে কাজ করিয়ে ৯০% ও আউটপুট পাবেন না। তাই এই ধারণা থেকেও আমাদের বের হতে হবে।

🔹 ভুল ধারণা- ৩: একটি ফেসবুক পেইজ খুলেই ই-কমার্স করা যায়।

প্রচলিত ব্যবসার ধারণা হলো কোনো অফিস বা দোকান থাকবে। কিন্তু আমি যদি বলি একটি ভ্যানেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা যায় বা একটি গামলা বা বোলেও একটি দোকান দেয়া যায়। আপনি কি অবিশ্বাস করবেন? কেন রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকানদার রা তো তাই ই করে। সেটা কি তার ব্যবসা নয়। সে তা দিয়ে কি তার ফ্যামিলি মেইনটেইন করে না? তার মানে হলো হলো ফেসবুক পেজ খুলেও ব্যবসা করা যায়, সে টাকায় পরিবারও চলতে পারে এবং কাংখিত সেলও আসতে পারে। কিন্তু একজন পেশাদার ব্যবসায়িকে তার পেশাদার উপায়ে ই ব্যবসা করতে হবে। আর একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন – ফেইসবুক এর পেজ এর কোম্পনি টা আমার হতে পারে কিন্তু পেজ টা কিন্তু আমার ১০০% কন্ট্রোল এ নেই। যে কোনো সময়, যে কোনো উছিলায় ফেইসবুক আমার পেজ বন্ধ করে দিতে পারে। তখন কিন্তু আপনার কিছু করার থাকবে না। আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন।

🔹 ভুল ধারণা- ৪: একটি ওয়েবসাইট খুললেই ই-কমার্স ব্যবসা পরিপূর্ণ ভাবে পরিচালনা করা যায়।

আমাদের দেশে প্রথম আমরা যখন ই-কমার্সের সাথে পরিচিত হই তখন ধারণা ছিলো যে, একটি অনলাইন শপই হলো ই-কমার্সের শেষ কথা। কিন্তু আমরা এখন বুঝি একটি ই-কমার্স বা প্রচলিত ব্যবসার সাথে টেকনোলোজিক্যাল পার্থক্য ছাড়া তেমন কোনো পার্থক্য নেই। একটি দোকান দৈর্ঘ্য প্রস্থের, আরেকটি দোকান ভার্চুয়াল, এটাই শুধু পার্থক্য। আর এই ই-কমার্স সাইট ছাড়াও ই-কমার্সের আরো নানাবিধ কাজ রয়েছে। যেমন- পন্য সরবরাহ, সংরক্ষণ ও ডেলিভারী, মার্কেটিং, কাস্টমার কেয়ার, প্যাকেজিং ও বিশেষ অফার তৈরী ছাড়াও নানাবিধ কার্য্য। তাহলে এবার আপনারাই বুঝে নিন শুধু মাত্র ই-কমার্স ওয়েবসাইট খুললেই ই-কমার্স ব্যবসা পরিপূর্ণ ভাবে করা সম্ভব নয়।

🔹 ভুল ধারণা- ৫: লিগ্যাল ডকুমেন্ট ছাড়াই ই–কমার্স পরিচালিত হয়।

দেশের প্রচলিত আইন হলো আপনি যে ব্যবসা করেন না কেন আপনাকে অবশ্যই ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করতে হবে। কেউ যদি ট্রেড লাইসেন্স না নিয়ে দোকান চালায় তাতে যেমন দোকানে ক্রেতা আসতে পারে তেমনি ট্রেড লাইসেন্স না নিয়ে ব্যবসা করলেও করতে পারে। কিন্তু চোখে সেটা বেআইনি। তার আপনাকে প্রয়োজনীয় লিগ্যাল ডকুমেন্টস নিয়ে ব্যবসা করতে হবে যদি ব্যবসা সঠিকভাবে করতে চান। তাই আইনমেনে ব্যবসা করতে হলে আইনগত ডকুমেন্টস লাগবে আর কোনো সত্যিকারের উদ্যেক্তা বা ব্যবসায়ী কখনো লিগ্যাল ডকুমেন্টস ছাড়া ব্যবসা করবেনা।

🔹 ভুল ধারণা- ৬: ই-কমার্স ব্যবসায় ক্রেতাকে প্রতারণার সুযোগ বেশী থাকে, তাই বেশী প্রতারণা হয়।

এটাও ভুল ধারণা কারণ যারা সঠিকভাবে ব্যবসা করে তারা সহজে ক্রেতাকে ঠকাতে পারেনা। কারণ তাদের যাবতীয় ডকুমেন্ট থাকে এবং ক্রেতা চাইলে পন্য ফেরত দিতে পারে। বরং ফিজিক্যাল ব্যবসায় অনেকসময় সেটা সম্ভব হয় না। কিছু মানুষ প্রতারণার সুযোগ নেয় সেটা ক্রেতা সেজেও হতে পারে আবার বিক্রেতা সেজেও হতে পারে। প্রতারককে আমি ব্যবসায়ী বলতে রাজি নয়। একজন ই-কমার্স ব্যবসায়ী তিনি যদি প্রকৃত ব্যবসায়ী হন তাহলে তিনি কখনো প্রতারণা করতে পারেন না।

🔹 ভুল ধারণা- ৭: পড়াশুনার পাশা পাশি ই-কমার্স করা যায়।

আমাদের ছাত্র -ছাত্রীদের মধ্যে এটা অনেক বড় একটা ভুল ধারণা , কারণ আমি এমন অনেক ছাত্র -ছাত্রীদের কে দেখেছি তারা যখন ই-কমার্স শুরু করেছে তখন তাদের একাডেমিক পড়াশুনার মধ্যে অনেক বড় একটা গ্যাপ তৈরী হয়েছে। আবার যখন সে সিরিয়াসলি পড়াশুনায় মনোযোগ দিয়েছে তখন ব্যবসার মধ্যে অনেক প্রব্লেম তৈরী হয়েছে। এক পর্যায় গিয়ে দেখা গেছে- না হয়েছে তার ভালো রেজাল্ট , আর না হয়েছে তার ব্যবসা গুছানো। তবে একটা কথা বলা যেতে পারে – আপনার যদি ভবিষ্যতে ই-কমার্স ব্যবসা করার ইচ্ছা থাকে তাহলে ছাত্র -ছাত্রী অবস্থায় ব্যবসা শুরু করে না দিয়ে কোনো ই-কমার্স কোম্পানি তে পার্ট টাইম জব করতে পারেন। আর পড়া শুনার পাশা পাশি পার্ট টাইম জব আপনার রেজাল্ট এর খুব বেশি ক্ষতি করবে না। বরং ভবিষ্যতে আপনার ব্যবসা চালানোর জন্য অভিজ্ঞতার ঝুলিটা অনেক বড় হবে। এতে করে আপনার ভবিষ্যতে ব্যবসা লস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে। আশা করি পুরো বিষয়টা বুঝতে পেরেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top